সিগারেটে রাজস্ব ফাঁকি ৫১৮২ কোটি
-
- - নিজস্ব -
- প্রতিবেদক --
- ৫ মার্চ, ২০২৬
দেশে সকল পণ্য সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্যে বিক্রি হলেও সিগারেট ও বিড়ির ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করছে না উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। সিগারেট কোম্পানিগুলো খুচরা মূলে বিক্রেতাদের কাছে সিগারেট বিক্রি করছে, আর বিক্রেতারা তারা চেয়ে বেশি মুল্যে ক্রেতাদের নিকট সিগারেট বিক্রি করছে। সর্বত্র প্যাকেটের প্যাকেটে উল্লিখিত সর্বোচ্চ দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রয় মূল্যের ওপর কর আদায় সম্ভব হলে চলতি অর্থবছরেই ৫১৮২ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতো। আর এভাবে বছরের পর বছর তামাকজাত দ্রব্যে বিক্রয়ে বিপুল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো।
“সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে কোম্পানির কৌশল ও রাজস্ব আদায়ে এর প্রভাব : একটি সমীক্ষা” শীর্ষক একটি গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার ০৫ মার্চ ২০২৬ সকাল সাড়ে ১০ টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে “তামাক কোম্পানির মূল্য কারসাজি ও কর ফাঁকি রোধে করণীয়” শীর্ষক আলোচনা সভায় এ গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) যৌথভাবে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনটিটিপি’র গবেষণা সহকারী ইশরাত জাহান ঐশী। গবেষণার ফল উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, অতিউচ্চ স্তরে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে ৫১০.৩১ কোটি টাকা। একইভাবে উচ্চ স্তরে ১২৪.৪০ কোটি, মধ্যম স্তরে ১৯২৫.৫৮ কোটি টাকা এবং নিম্ন স্তরে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে ২৬২১.২৪ টাকা।
প্রকাশিত গবেষণায় ঢাকা, বরিশাল, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে বিভাগীয় শহরসহ আরো ২টি জেলা শহর মিলে মোট ১২টি শহর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি শহর থেকে চারটি করে মোট ৪৮টি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে সংজ্ঞায়িত পাবলিক প্লেসের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে এ তথ্য নেয়া হয়েছে।
গবেষণার সুপারিশে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে সিগারেট বিক্রি নিশ্চিত করা এবং নিয়ম অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার পাশাপাশি পূর্ববর্তী অবৈধ ব্যবসার জন্য শাস্তির আওতায় আনা; কর আদায় ও বাজার মনিটরিংয়ে গুরুত্ব দিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা; সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রি নিষিদ্ধ করা; সিগারেটের বহু স্তর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে একটি স্তরে নিয়ে আসা; সিগারেটে অ্যাডভেলরেম কর পদ্ধতির পরিবর্তে রাজস্ব বৃদ্ধি ও তামাকের ব্যবহার কমাতে সুর্নিদিষ্ট করারোপ পদ্ধতি প্রচলন করা; এবং তামাক কোম্পানি থেকে সরকারের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার করা এবং বিকল্প রাজস্ব উৎসের সন্ধান করা।
অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বিএনটিটিপির কনভেনর অধ্যাপক ড. রুমানা হক, তামাকমুক্ত রেলওয়ে প্রকল্পের কন্সালটেন্ট ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল (এনটিসিসি) এর সাবেক সমন্বয়কারী হোসেন আলী খোন্দকার এবং জনস্বাস্থ্য ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক এবং স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনটিটিপির প্রজেক্ট ম্যানেজার হামিদুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ আলোচকরা বলেন, এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করে যে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে তা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৫টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের সমান। রাজস্ব ফাঁকির এ টাকা দিয়ে সারাদেশে হৃদরোগের চিকিংসা ফ্রি করে দেয়া সম্ভব। আমার সিগারেটের রাজস্ব ফাঁকির স্থায়ী সমাধান চাই। এজন্য এনবিআর গবেষণা করে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করতে পারে।
তারা আরও বলেন, এমআরপি’র চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির মাধ্যমে কেবল রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে না। তরুণদেরও এর মাধ্যমে ধূমপানের প্রতি আগ্রহী করে তোলা হচ্ছে। কারণ এর মূলেই রয়েছে খুচরা শলাকা বিক্রি। আমরা খুচরা শলাকা বিক্রি নিষিদ্ধ করার দাবি জানালেও সরকার সেটা আমলে নেয়নি। অথচ খুচরা শলাকা বিক্রির জন্যই রাজস্ব ফাঁকি বাড়ার পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে ধূমপানের হার বাড়ছে। একইসঙ্গে খুচরা শলাকা বিক্রির কারণে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা দেখে সচেতন হতে পারছে না ধূমপায়ীরা।
আলোচনা সভায় দেশে কর্মরত তামাক বিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন এবং তারা গবেষণার ওপর প্রশ্নোত্তরপর্বে অংশ নেন।